রোজার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

ভূমিকা
রোজার সংজ্ঞা রোজা বিষয়ে আমাদের ধারণা আরও স্বচ্ছ করে, শুদ্ধ করে রোজা বিষয়ে আমাদের জ্ঞান। সে হিসেবে ইসলামি শরীয়তের প্রতিটি বিধানের সংজ্ঞা বিষয়ে স্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য জরুরি।

তবে এ বিষয়ে একটি কথা বলে নেয়া ভালো। আর তা হলো এই যে, ধর্মীয় পরিভাষার সংজ্ঞাগুলো মূলত কুরআন সুন্নাহর গবেষণা থেকে উৎকলিত। অর্থাৎ এ সংজ্ঞাগুলোর সীমানা, কাঠামো ও শব্দমালা ইসলামি স্কারদের নির্মিত। শাস্ত্রিক আদলে সংজ্ঞা দেয়া কুরআন সুন্নাহর সাধারণ ট্রেন্ড নয়। এটা বরং এরিস্টটলীয় লজিকের একটি ধারা যা জ্ঞান সাধনায় উপকারী বলে ইসলামি স্কলারগণ আপন করে নিয়েছেন। জ্ঞান সাধনা ও জীবন বিনির্মাণের ক্ষেত্রে যা কিছু উপকারী তা অবশ্যই অনুসরণ করা যায়; কারণ প্রজ্ঞা হলো মুমিনের হারানো সম্পদ, সে তা যেখানে পায় সেখান থেকে লুফে নেয়।

বিষয়টি আরো পরিষ্কার করার জন্য বলা যায় যে, আল ‍কুরানে রোজা রাখার নির্দেশ, পদ্ধতি, সময়সীমা সম্পর্কে বক্তব্য পাই। যেমন সূরা আল বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে রোজা মুমিনদের ওপর ফরজ হওয়ার কথা পাই (১)  । এরপর একই সূরার ১৮৭ নং আয়াতে সুবহে সাদিক (সত্যপ্রভাত) হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার সময়সীমা,খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা এবং স্বামী-স্ত্রীর ইন্টারকোর্স থেকে বিরত থাকার কথা পাই। (২) এসব আয়াত একসাথ করে রোজার একটি শাস্ত্রিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাঁড় করানো যায়। যা নির্মিত হবে কুরান হাদিসের আলোকে তবে এর শব্দগুলো হবে মানবিক অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির প্রয়োগকৃত।

সংজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সাধারণত করা হয়, তা হলো প্রথমে আভিধানিক অর্থের কথা বলা হয়। এরপর পারিভাষিক সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়। আভিধানিক অর্থ বলতে এখানে বুঝায় আরবি ভাষাভাষীরা, ভাষার বিশুদ্ধতার যুগে যে অর্থে অথবা অর্থসমূহে কোনো শব্দ ব্যবহার করেছেন তা। আরবি ভাষায় বেশ কয়টি মৌলিক অভিধান আছে, যা সে ব্যবহারগুলো লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। যেমন আল মুখাস্সাস, লিসানুল আরব, কামুসুল মুহিত ইত্যাতি। আর পারিভাষিক সংজ্ঞা সংগ্রহ করা হয় ফেকাহ শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে, বিশেষ করে ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ থেকে। ইমাম আল জুরজানি (র.) এর ‘আত্-তারিফাত’ গ্রন্থ থেকেও অনেকেই পারিভাষিক সংজ্ঞা নিয়ে থাকেন। গ্রন্থটি নিয়ে আলাদ একটি প্রবন্ধে আলো করব বলে আশা।

এবার আসা যাক রোজার আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থে:
রোজা ফার্সি শব্দ। এর আরবি হলো সাওম ( صوم ) বা সিয়াম ( صيام ) । সাওম ও সিয়ামের অর্থ একই। অনেকেই ভাবেন, সিয়াম শব্দটি সাওমের বহুবচন, যা ভুল। উভয় শব্দই صام يصوم এর ক্রিয়ামূল বা মাসদার।

রোজার আভিধানিক অর্থ:

বিরত থাকা। আরবিতে إمساك । প্রাচীন আরবি ভাষাবিদ আবু উবায়দ (জ. ৭৭৪ -মৃ. ৮৩৮) বলেছেন, ‘খাওয়া, অথবা কথা, অথবা হাঁটা থেকে বিরত থাকে এমন যেকোনো ব্যক্তিকেই সায়িম বলা হবে।’ (৩)
আর শাস্ত্রিক পরিভাষা হিসেবে রোজা হলো,‘সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয়, স্বামী-স্ত্রীর মিলন থেকে ইবাদতের নিয়তসহ বিরত থাকা। (৪)

রোজার প্রকারভেদ

রোজা প্রথমিকভাবে দুই প্রকার।

এক. শরীয়তসিদ্ধ রোজা

শরীয়তসিদ্ধ রোজা আবার দুই প্রকার

ক. আবশ্যিক রোজা অথাৎ যে রোজা ফরজ বা ওয়াজিব।

এই রোজা আবার দুইভাগে বিভক্ত:
১. যা রোজা পালনকারীর নিজস্ব কোনো ভূমিকা ছাড়াই কেবল ইবাদত হিসেবে শরীয়তদাতা আবশ্যিক করে দিয়েছেন। যেমন রমজানের রোজা। এই রোজা ফরজ হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। প্রখ্যাত হাদিস ব্যাখ্যাকার ইমাম নববি (জ.১২৩৩ খৃ.-১২৮৭ খৃ.) বলেন, নিচক শরীয়ার আদেশ হেতু রমজানের রোজা ছাড়া অন্যকোনো রোজা ফরজ হয়নি। বিষয়টি ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। (৫)

খ. নফল রোজা

ফরজ ও ওয়াজিব নয় এমন সকল রোজাই নফল রোজা।
নফল রোজা আবার দুই প্রকার:

১. অনির্দিষ্ট নফল রোজা।

অর্থাৎ সেসব রোজার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। বরং রোজা রাখা একটি নেক আমল হিসেবে নিষিদ্ধ দিনগুলো বাদে যেকোনো দিন তা পালন করা যায়, শরীয়তের এই মূলনীতির আওতায় অনির্দিষ্টভাবে যেকোনো দিন রাখা। এই ক্যাটাগরির সকল রোজা অনির্দিষ্ট নফল রোজা হিসেবে বিবেচিত হবে।

২. সুনির্দিষ্ট নফল রোজা:

আর তা হলো ওই সব নফল রোজা যা সুনির্দিষ্ট দিনে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন শাওয়ালের ছয় রোজা, প্রতি সপ্তাহে সোব বার ও বৃহস্পতি বারের রোজা। আরাফা দিবসের রোজা। মহররম মাসের নয় ও দশ তারিখের রোজা।

দুই. নিষিদ্ধ রোজা

নিষিদ্ধ রোজা দুই প্রকার:

১. হারাম রোজা:

যেমন ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহা দিবসের রোজা।

২. মাকরুহ রোজা:

যেমন হজপালনকারী ব্যক্তির জন্য আরাফার ময়দানে অবস্থানরত অবস্থায় আরাফা দিবসের রোজা।

[১] يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ( সূরা আল বাকারা: ১৮৩

[২]فَالآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ (সূরা আল বাকারা:১৮৭

[৩] রাজি, মুখতারুসসিহাহ, পৃ ১৮০-১৮১

[৪] إمساك مخصوص، وهو الإمساك عن الأكل والشرب والجماع من الصبح إلى المغرب مع النية. (জুরজানি, আত-তারিফাত, অধ্যায়: সাদ, শব্দ: সাওম)

[৫] قال النووي : لايجب صوم بغير رمضان بأصل الشرع بالإجماع (ইমাম নববি, আল মাজমু: ৬/২৪৮)

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *